সুরা মাউনে যে মানবিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে

গেজেট প্রতিবেদন

পবিত্র কোরআনের ছোট সুরাগুলোর একটি সুরা মাউন। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, সুরাটি মক্কায় নাজিল হয়েছে। সুরাটিকে একটি উচ্চতর নৈতিক নির্দেশনা এবং আচরণগত পথনির্দেশ হিসেবে দেখা যায়। এতে ঈমানের বিষয়টি এমন এক অনন্য নৈতিক ও আচরণগত দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছে, যার প্রতি সাধারণত খুব কমই মনোযোগ দেওয়া হয়।

বিশেষ করে সমকালীন দাওয়াতি বক্তব্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, কখনো কখনো নৈতিকতাকে সঠিক ধর্মীয় জীবনের ভিত্তি হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ মানুষের নাজাত ও দ্বীনের যথার্থতার ক্ষেত্রে নৈতিক দিকের গুরুত্ব আকিদাগত দিকের মতোই অপরিহার্য। নৈতিক ও আচরণগত বিষয়কে গৌণ কোনো বিষয় হিসেবে দেখানো কোরআনের পথ থেকে বিচ্যুতি। কারণ কোরআন এগুলোকে দ্বীনের ভিত্তি, মৌলিক বিষয় ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এ কারণেই সঠিক ধর্মীয় জীবনযাপনের বৈশিষ্ট্যগুলো অনুধাবনের জন্য কোরআনের কাছে ফিরে যাওয়া জরুরি। এমন বক্তব্য ও বিতর্ক থেকে দূরে থাকা দরকার, যেখানে আকিদার বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও মতভেদপূর্ণ বিষয়ে বিভাজন, বিদআত বা ফাসেক আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এসবের অনেক কিছুই ইতিহাসের নানা স্তর ও বিতর্কের ফল।

এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সুরাটির বিভিন্ন অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে কিছু ভাবনার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করি, এর মাধ্যমে সঠিক পথের সন্ধান পাব এবং তা অনুসরণ করা সহজ হবে।

ঈমান মানেই মমতা
সুরাটি শুরু হয়েছে এতিমের সঙ্গে অত্যন্ত নির্মম আচরণের নিন্দার মাধ্যমে। এতিম মানবিক দুর্বলতার চূড়ান্ত অবস্থার প্রতীক। কারণ একজন এতিমের মধ্যে তিন ধরনের দুর্বলতা একসঙ্গে থাকে। প্রথমত, শারীরিক দুর্বলতা—সে এখনো পূর্ণবয়স্ক হয়নি। দ্বিতীয়ত, মানসিক দুর্বলতা—সে শিশুই। তৃতীয়ত, তার কোনো সাহায্যকারী বা অভিভাবক নেই।

স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন কোনো মানুষই এমন অবস্থার প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে পারে না। এর সঙ্গে যদি দারিদ্র্য ও অভাব যুক্ত হয়, তাহলে মায়া, মমতা ও সাহায্যের তাগিদ আরও বেড়ে যায়।

এই পরীক্ষার জায়গাতেই কোরআন আমাদের মমতাহীন না হওয়ার শিক্ষা দেয়। কারণ এতে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করা হয়, অথচ মানুষের এই সুস্থ স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকেই ধর্ম দৃঢ় করেছে এবং কাজে লাগাতে চেয়েছে।

কোরআনের এই উদাহরণ থেকে আমরা ঈমানি জীবন গঠনে সৃষ্টির প্রতি মমতার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি। এর বাস্তব প্রকাশ হলো কোমলতা, বিনয় এবং দুর্বল মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানো, বিশেষ করে যখন তার প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রকৃত মুমিন সে-ই, যার হৃদয়ের মমতা মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতিতে প্রকাশ পায়। এর মাধ্যমেই সে প্রমাণ করে, তার অনুসৃত জীবনপদ্ধতি সঠিক এবং সে যে শরিয়তে বিশ্বাস করে, সেটি পবিত্র ও কল্যাণময়। ইবনে কাইয়িম রহ. যেমন বলেছেন, এই শরিয়ত পুরোটাই রহমত।

দুর্বল ও অসহায়দের পাশে
সত্যিকারের ঈমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত অসহায় মানুষের প্রতি যত্নশীল হওয়া। শুধু ব্যক্তিগতভাবে অসহায় মানুষকে সাহায্য করাই যথেষ্ট নয়; অন্যদেরও তাদের অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো জরুরি।

এটি সৎকাজের আদেশ দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপ। এটি না করলে মানুষ দ্বীনের সত্যতা অস্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, এবং সে অভাবগ্রস্তকে খাবার দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করে না।

অতএব, মানুষকে অভাবী ও ক্ষুধার্তদের অধিকার আদায়ে উৎসাহিত করা একটি মহৎ কোরআনি নির্দেশনা। এর লক্ষ্য হলো সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্টের প্রতি উদাসীন স্বার্থপরতা দূর করা এবং সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

এর পরিধি ব্যক্তিগত দান-সদকা থেকে শুরু করে বৃহত্তর সামাজিক, মানবিক, অধিকারভিত্তিক এমনকি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষ করে যখন কোনো শাসকগোষ্ঠীর নীতি হয়ে দাঁড়ায় মানুষকে ক্ষুধার্ত রাখা ও দরিদ্র করে ফেলা, কিংবা অন্যায় যুদ্ধের কারণে মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হয়, অথবা এমন কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু থাকে যা সম্পদ নিঃশেষ করে এবং তা সঠিকভাবে বণ্টন করে না—তখন এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নামাজ ও সামাজিক সম্পর্ক
নামাজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। নামাজ এমন এক ইবাদত, যার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণের শক্তিগুলো জাগ্রত হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও কল্যাণের দরজা খুলে যায়।

কিন্তু কিছু মানুষ নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত শুধু বাহ্যিকভাবে পালন করে। এর ভেতরের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য তাদের জীবনে প্রতিফলিত হয় না। তারা কখনো এসব ইবাদতকে লোক দেখানো এবং মানুষের কাছে মর্যাদা বা গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের সামাজিক আচারে পরিণত করে।

অথচ তারা ভুলে যায়, নামাজ আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন ও ইবাদত। এর মাধ্যমে হৃদয় জীবন্ত হয় এবং আখিরাতের দরজা উন্মুক্ত হয়।

এই অর্থ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে মানুষের ওপর দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা প্রভাব বিস্তার করে। তার হৃদয় কৃপণতা ও সংকীর্ণতায় আবদ্ধ হয়ে যায়। এমনকি সে মাউনও আটকে রাখে। মাউন বলতে এমন সব প্রয়োজনীয় জিনিস বোঝায়, যা অন্যকে ধার দিলে নিজের কোনো ক্ষতি হয় না। যেমন দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারের বিভিন্ন পাত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী।

এটি এমন এক সামাজিক বিচ্ছিন্নতার চিত্র, যার ভিত্তি স্বার্থপরতা ও মিথ্যা সম্পর্ক—যদিও এর ওপর ধর্মের আবরণ চাপানো থাকে।

এর বিপরীতে রয়েছে সামাজিক সংহতির একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষ পরস্পরের প্রতি মমতাশীল, একে অন্যের সঙ্গে সম্প্রীতিপূর্ণ ও সহযোগিতাপূর্ণ হয় এবং সবাই একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়।

মাউন শব্দটি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতবাহী শব্দ। এটি মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা, উন্মুক্ততা, পারস্পরিক মমতা, উপকার ছড়িয়ে দেওয়া এবং উদারতার বিভিন্ন রূপ ও সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে। অতএব, নামাজ হলো আত্মিক ভিত্তি আর সামাজিক সম্পর্ক হলো ঈমানের যথার্থতার আচরণগত প্রমাণ।

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন